ধর্মীয় (Religious) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধর্মীয় (Religious) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১০

ইসলাম কি আরব কেন্দ্রিক...?





বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম


(প্রথমেই বলে রাখি যে আমি এখানে শুধু মাত্র আমার জ্ঞ্যান যেটুকু আমি জানি তাই সবার সাথে ভাগাভাগি করতেচাচ্ছি। যদি এখানে কোন ভুল ধরা পড়ে, তবে দয়া করে সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি এবং বন্ধুসুলভ আচরনের মাধ্যমে তা শুধরানোর চেষ্টাকরাই ভালো হবে। দয়া করে কেউ জটিলতা সৃষ্টি করবেন না।)

বেশীরভাগ সময়ই যখন আমরা কোন ইসলামী কাহিনী শুনি, সেটা দেখি আরব বা তার আশপাশের নগর থেকেআসছে। কিন্তু ইসলাম কোন জাতিগত ধর্মতো নয়। তাহলে কেন শুধু আরবদের কাহিনী আমাদের শুনতে হয়? স্বভাবতইএধরনের প্রশ্ন আসতে পারে তাদের মনে যারা সব ক্ষেত্রে খুত খোজার চেষ্টা করে বা যারা সত্যিকার অর্থেই কিছু জানার আগ্রহরাখে।

তবে আমি যতদুর দেখেছি এবং বুঝেছি, তাতে আমার ধারনাগুলো হল-

আরব দেশটা পৃথিবীর মানচিত্রে মাঝখানের দিকে অবস্থিত আর পবিত্র কাবা ঘর এই পৃথিবী নামক গ্রহের ঠিকমধ্যবর্তী একটা অবস্থানে স্থাপিত।

যখন আদম ও হাওয়া (আ) কে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে প্রেরন করা হয়, তাদেরকে কে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পাঠানোহয়। আমি গল্প শুনেছি যে, আদমকে (আ) সাগরে ফেলা হয়েছিল এবং হাওয়াকে (আ) পাঠানো হয়েছিলো জমিনে যা বর্তমানেআফ্রিকা হিসেবে পরিচিত। আমি আরও শুনেছি যে আদম ছিল শ্বেতাঙ্গ এবং হাওয়া ছিল কৃষাঙ্গ। এখানে আরও উল্লেখ্য যেতখন পৃথিবীর জমিন একসাথে ছিল অর্থাৎ বিভিন্ন মহাদেশের বিভাজন ছিলনা।

এই অবস্থায় যখন আদম এবং হাওয়া (আ) আল্লাহর কাছে নিজেদের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকে তখন তারা জমিনেরকেন্দ্রের দিকে (বর্তমান আরবের দিকে) এগুতে থাকে। এবং বহু বছর পর যখন তাদের তওবা হুজুর পাক (সাঃ) এর ওছিলায়কবুল হয়, তখনই তারা একে অপরকে খুজে পায়েমন এক স্থানে যা বর্তমানে আরাফা ময়দান হিসেবে পরিচিত। তারপরআরাফার পাশেই তারা পৃথিবীর প্রথম ঘর তৈরী করে যা এখন পবিত্র কাবা ঘর হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। আর এখানথেকেই ইসলামের আরব কেন্দ্রিক কাহিনী শুরু।

এরপর পরবর্তী নবীগন একজনের পর একজন আসতে থাকে, এবং সবাই একটা বার্তা নিয়েই আসে, “লা- ইলাহাইল্লাল্লাহ”, তবে পাশাপাশি তারা কিছু শিক্ষা মানুষ কে দিতে থাকে যেমন, আদম (আ) এর পর শীছ (আ) এর সময় মানুষ কাপড়বোনা, জমি চাষ করা ইত্যাদি শিক্ষা পায়। আমি কিছু রহস্য পত্রিকা এবং সেবা প্রকাশনীর অনেক সায়েন্সফিকশন পড়েছিযেখানে পেয়েছি যে প্রাথমিক যুগে যখন মানুষ কিছু জানতোনা, তখন ভিন গ্রহের প্রানীরা এসে মানুসকে অনেক কিছু শিখিয়েদিয়ে গিয়েছিল। আবার আমি শীছ (আ) কিছু ঘটনা শুনেছি যে, যখন তারা খাবার বা চাষাবাদ করতে জানতো না, তখন তারাএকদিন দেখলো যে মাঠে একদল লোক জমি চাষ করছে, কিছু মহিলা গাছের বাকল দিয়ে কাপড় তৈরী করছে ইত্যাদি। তারাতাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছিলো কিন্তু কারা ঐ লোকগুলা? এব্যপারে কোন হদিস আমি পাইনি, আল্লাহ আর তার প্রিয়বান্দারাই ভাল জানেন।

মানুষ বংশ বিস্তার করতে করতে জমিনে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, এবং ব্যবিলনে মানব সভ্যতার তৃতীয় নবী ইদ্রীস (আ) আসেন, তার সময় মানুষের লেখা পড়ার শিক্ষা শুরু হয়, মনে হয় ব্যবিলনই প্রথম লেখালেখির প্রচলন শুরু হয়। ইদ্রিস (আ) তার অনুসারীদের নিয়ে ব্যবিলন থেকে মিশর চলে আসেন, অর্থাৎ আরেক আরব এলাকা।

এরপর নূহ (আ) আসেন এবং তার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে যুগান্তকারী একটা বস্তু উপহার দেন- নৌকা। নূহেরনৌকাই পৃথিবীর প্রথম নৌকা। এবং বন্যা শেষ হওয়ার পর নূহ (আ) এর নৌকা বর্তমান তুরস্কের এক পাহাড়ে গিয়ে আটকায়যার নিশানা এখনও তুরস্কে আছে। তুরস্ক আরেকটি আরব দেশ। এর পর নুহ (আ) এক বংশধর ভারতের দিকে চলে আসে যারইতিহাস খুবই অস্পষ্ট (আমার কাছে)। তবে লোক জনের ভীড় থাকে আরব কে কেন্দ্র করেই। যদিও নূহ এর বন্যার পর বহুবছর কাবা ঘর মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকে এবং মক্কা নগরী থাকে জনশুন্য। কিন্তু মক্কার চারপাশে জনবস্তি গড়ে উঠেছিলবহুত। আর তারপর ইব্রাহীম (আ) ও ঈসমাইল (আ) এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মক্কা কে আবার জনবহুল করে তুলেন।


ঈসমাইল (আ) এবং মক্কা পুনরুত্থান এর পর এই নপগরীতে আর কোন নবী আসেনি। কিন্তু নবী আসা থেমে থাকেনি মিশর, তুরস্ক, এবং মক্কার আশপাশের নগরীতে। হযরত মূসা মিশর থেকে জেরুজালেম চলে আসেন, এবং এখানে একাধারে দাউদ, সোলায়মান এবং সর্বশেষ ইসরায়েলী নবী ঈসা প্রেরীত হন। আর তারপর সময় আসে আবার মক্কার, যেখানে একদিন সর্বপ্রথমনবী তার যাত্রা শুরু করেছিলো, সেখানেই আবার সর্বশেষ নবী (সঃ) আবির্ভুত হন।

দেখা যাচ্ছে এযাবৎ সব কিছুই আরব কেন্দ্রিক হচ্ছে। কিন্তু কেন? পৃথিবীতে কি আর কোন দেশে মানুষ ছিলনা? তাদেরকাছে কেন ইস্লামের নবী আসেনি? আল্লাহ কি তাদের পথা দেখানোর জন্য কাউকে পাঠাননি? আমার মতে এখানে ২ টা উত্তরআছে-

১) নবী পাঠানোর প্রক্রিয়াটা চলছিলো মানব সভ্যতার প্রাথমিক যুগে। আর যখন সর্বশেষ নবী (স) আসেন, তখনওপৃথিবীর প্রান্তে বহুল জনবসতি গড়ে উঠেনি।

২) আল্লাহ যুগে যুগে বহু নবী পাঠিয়েছেন যাদের মাত্র কয়েকজনের নাম পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তুএছাড়াও যে তিনি নবী পাঠিয়েছে ( এক লক্ষেরও বেশী ) সেটা মুসলিম উলামারা স্বীকার করে। এর মানে হল, কে জানে হয়তোআমাদের মাঝেও কেউ এসেছিলো অথচ আমরা টের পাইনি, সে তার কাজ করে গেছে।

আমি দেখেছি হিন্দু দের প্রধান গ্রন্থ বেধ। ( রামায়ন বা গীতা হিন্দুদের প্রধান গ্রন্থ কিনা আমি নিষচিত নই, তবে আমিযতদুর জানি এগুলা রচনা করা হয়েছিল মুনী ঋষীরা যারা মনরঞ্জনের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলো) । বেধ এ এমনঅনেক বাক্য আছে যা পবিত্র কোরআনের সাথে মিলে যায় এবং এমন অনেক বাক্য আছে যা একজন শেষ যুগে এওজন মহাঋষীর আবির্ভাবের কথা বলে যা মুহাম্মদ (স) এর সাথে মিলে যায়। অথচ এই বেধ কোথা থেকে এসেছিলো, কে এর রচয়ীতা, এটা এওটা রহস্য। যদিও বেধের ৭০ ভাগই এখন হারিয়ে গেছে কিন্তু এখনও বেধের মধ্যে অনেক রহস্য আছে যা চর্চা করলেমানুষের অনেক ভুল ভেঙ্গে যেতে পারে। কিন্তু হিন্দুরা বেধ নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাতে চায়না। তারা মনরঞ্জনে মননিবেশঅরেছে।

তবে এটা ঠিক যে আল্লাহ কখনই কোন জাতিকে অবিভাবকহীন করে রাখেননি, সবার কাছেই তিনি তার রাসুলপাঠিয়েছেন। কিন্তু শয়তানও বসে থাকেনি, সে মানুষ কে প্রতি মুহুর্তে দিকভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। আল্লাহ আমাদের মাফকরুন, এবং সঠিক পথে চলার তৌফিক দিন, এবং আমাদের জান্নাতের পথে কবুল করুন… আমীন।

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

শ’বে কদরের আমল…

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন -

যে ব্যক্তি রমযানের ২৭ তারিখে শ'বে কদরের রাত্রিতে প্রত্যেক রাকয়াতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কদর ১ বার এবং সূরা এখলাছ ২৭ বার দ্বারা ৪ রাকয়াত নামায পড়ে, তাহলে সে সমস্ত গুনাহ্‌ থেকে পাক হয়ে যাবে, যেন মায়ের উদর হতে অদ্যই ভুমিষ্ঠ হলো। আল্লাহ তা'আলা তাকে বেহেশ্‌তের মধ্যে ১০০০ বালাখানা দান করবেন।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন -

যে ব্যক্তি শ'বে কদরের রাত্রিতে সূরা ফাতিহার পর ১ বার সূরা কদর ও ৩ বার সূরা এখলাছ দ্বারা ২ রাকয়াত নফল নামায পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তাকে শ'বে কদরের রাত্রের সমস্ত সওয়াব দান করবেন, তার জন্য রুজী বৃদ্ধি করবেন এবং তাকে হযরত ইদ্রীছ (আঃ), হযরত শোয়ায়েব(আঃ), হযরত ইউনুছ (আঃ), হযরত দাঊদ (আঃ) ও হযরত নূহ (আঃ) এর সওয়াব দান করবেন। তাকে আল্লাহ তা'আলা বেহেশ্‌তের মাশরেক থেকে মাগরেব পর্যন্ত বড় একটা শহর দান করবেন।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন -

যে ব্যক্তি রমযানের ২৭ তারিখের রাত্রিতে প্রত্যেক রাকয়াতে সূরা ফাতিহার পর ৩ বার সূরা কদর ও ৫০ বার সূরা এখলাছ দ্বারা ৪ রাকয়াত নামায পড়বে এবং সালাম ফিরিয়ে সেজদায় গিয়ে পড়বে-

"ছুব হানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার"

অতপর সেই ব্যক্তি যেই দোয়া আল্লাহ তা'আলার দরগাহে চাইবে তা অবশ্যই কবুল হবে (ইনশা আল্লাহ !)। আল্লাহ তা'আলা তাকে অসীম নেয়ামত দান করবেন এবং সমস্ত গুনাহ্‌ মাফ করবেন।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন -

যে ব্যক্তি রমযানের ২৭ তারিখের রাত্রিতে নামাযের নিয়ত করে গোসল করে- পা ধুইবার পুর্বেই আল্লাহ তা'আলা তার সমস্ত গুনাহ্‌ মাফ করে দিবেন।

তবে ৪ প্রকার ব্যক্তি শ'বে কদরের এই সকল অফুরন্ত নেয়ামত থেকে বঞ্চিত-

১) সর্বদা যে ব্যক্তি মদ্যপানে আসক্ত,

২) যে ব্যক্তি পিতা-মাতার অবাধ্য,

৩) যে আত্মীয়-স্বজনের সংশ্রব ত্যাগ করে এবং

৪) যে ব্যক্তি মুসলমানের সাথে শত্রুতা করে।

আল্লাহ আমাদের এসব থেকে রক্ষা করুন এবং হেদায়েত দিন।

আমার কথাঃ-

যদিও আমরা জানি এবং এটা এখন মোটামুটি স্বীকৃতি পেয়ে গেছে যে রমযানের ২৭ তারিখ দিবাগত রাত্রেই হলো মহিমাম্বিত রাত শ'বে কদর, তারপরেও আমি বলবো, এই বিশ্বাস নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারন এখনও পর্যন্ত আমি কোন সহীহ্‌ হাদীস পাইনি যা ২৭ তারিখ কেই শ'বে কদর হিসেবে নিশ্চিত করেছে (যদিও আমি হাদিসে বিশেষ পন্ডিত নই)।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন শ'বে কদরের তারিখটা ওহী মারফত প্রাপ্ত হয়ে যখন সাহাবাদের জানাতে আসেন, তখন দুই সাহাবার বাক-বিতন্ডা দেখে তাদের সামলাতে গিয়েই তিনি তারিখটা ভুলে যান (সবই আল্লাহর ইচ্ছা)। এবং তারপর তিনি নিজেও আর কাউকে এব্যপারে স্পষ্ট কোন ধারনা দেননি।

হুজুর পাক (সাঃ) শ'বে কদরের ব্যপারে আবু ছাইদ (রাঃ) কে ২১ তারিখ, আলী (রাঃ) কে ২৩ তারিখ, আবুবকর সিদ্দিকী (রাঃ) কে ২৭ তারিখ এর কথা বলেছেন। আমার নবী মিথ্যা বলেননা, এবং এব্যপারে ভুল বলাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব এখানে কোন এক জায়গায় রহস্য আছে। হয়তো শ'বে কদর কোন বিশেষ কারও জন্যে বিশেষ কোন দিনে। হয়তো আবু ছাইদ (রাঃ) এর জন্য তা ২১ তারিখ ছিলো, আলী (রাঃ) এর জন্য ২৩ আর সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) এর জন্য ২৭, হয়তো আমার জন্য অন্য কোন তারিখ। অবশ্য এটা আমার নিজের ধারনা, আমি এতে কাউকে বিশ্বাস করতে বলছিনা, বরং অনুরোধ করবো কেউ যেন বিভ্রান্ত না হোন। যাইহোক, তবে একথা নিশ্চিত যে শ'বে কদর রমযানের শেষ বেজোড় ৫ রাত্রের ভিতরেই আছে। আর যেহেতু শ'বে কদর তালাশ করার উপরেই জোর দেওয়া হয়েছে বেশী, তাই কেননা আমরা এই ৫ টা রাত্রিই একটু কষ্ট করি? আমার মতে এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন, আমীন।

আরেকটা কথা- অনেকে বলে, যারা সারা বছর ফরজ আদায় করেনা, তাদের এসব নফল নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই। আমার কাছে ব্যপারটা মোটেও গ্রহনযোগ্য না। কারন- ফরজ এর জন্য তাদের তাগিদ দেওয়া উচিৎ, আদায় করুক আর না করুক সেটা তাদের ব্যপার। নফলের জন্য তাগিদ দিতে হয়না, কিন্তু কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় নফল আদায় করতে চায়, তাকে বাধা দেওয়া মোটেও উচিৎ হবেনা। কে জানে, আল্লাহ হয়তো তাকে এই নফলের ওছিলায় হেদায়েত দেবে আর সে এরপর থেকে ফরজের প্রতি মনোযোগীও হতে পারে। কারন মহান রাব্বুল আলামীন বান্দাকে হেদায়েত ও মাফ করার জন্য নানান ওছিলা খোজেন। তাই তাদেরকে উৎসাহ দেওয়া উচিৎ।

শ'বে কদরের রাত্রে এই দোয়া পড়া আবশ্যকঃ-

"আল্লহুম্মা ইন্নাকা আফুয়ুন তুহিব্বুল আফুয়ুন ফায়াফু আন্নী ইয়া গাফুরু ইয়া গাফুরু ইয়া গাফুরু"।

রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

শ’বে কদরের ফজ়িলত

হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্নিত, হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের জন্য শ'বে কদরে দন্ডয়মান হয় অর্থাৎ নামায পড়ে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ্‌ মাফ হয়ে যায়।"

শ'বে কদর একটি মহান রাত্রি। এই রাত্রি বরকত ও রহমত পুর্ণ, অন্য কোন রাত্রি এই রাত্রির মর্যাদায় পৌছোতে পারেনা। হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা শ'বে কদরের সহিত অন্য রাত্রিসমুহকেও সৌন্দর্য দান করেছেন।"

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"রাত্রিসমুহের মধ্যে শ'বে কদরই উত্তম।"

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"রমযানের শেষ ১০ রাত্রির মধ্যে শ'বে কদরকে অনুসন্ধান কর এবং উহার মধ্যে বেজোড় রাত্রি সব অনুসন্ধান কর অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখ।"

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"যদি তোমরা চাও যে তোমাদের কবর নুরের দ্বারা উজ্জ্বল হোক, তা হলে তোমরা শ'বে কদরের রাত্রে এবাদত কর।"

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"যে ব্যক্তি শ'বে কদরকে জিন্দা রাখে, কেয়ামতের দিন তার দিল মুরদা হবেনা এবং আল্লাহ ত'আলা তার ছগীরা-কবীরা অর্থাৎ ছোট বড় সমস্ত গুনাহ্‌ মাফ করে দেবেন।"

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"যে ব্যক্তি শ'বে কদরকে জিন্দা রাখে, সে একশত বছরের সওয়াব পাইবে। এর কারন এই যে আল্লাহ তা'আলা শ'বে কদরকে লুক্কায়িত করেছেন, যেন বান্দা উহা তালাশ করবার আগ্রহ রাখে অর্থাৎ প্রেমিকদের মত অনুসন্ধান করে।"

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"যে ব্যক্তি শ'বে কদর পাবে, আল্লাহ তা'আলা তার উপর দোযখের আগুন হারাম করে দিবেন এবং তার সমস্ত অভাব পুর্ণ করে দেবেন।"

হযরত ছাঈদ (রাঃ) বলেছেন, আমি একবার রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাস করলাম,

"হে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! শ'বে কদরের রাত্র কোনটি?" তিনি বললেন, "হে আবু ছাঈদ, উহা রমযানের ২১ তারিখে। "পুনরায় হযরত আলী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, "হে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! রমযানের মর্যাদাপুর্ণ রাত্রি কোনটি?" তিনি বললেন, "হে আলী (রাঃ), উহা রমযানের ২৩ তারিখে। "পুনরায় হযরত সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, "হে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! এই পবিত্র মাসে কোন রাত্রি শ'বে কদর?" হযরত বললেন, "আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ), রমযান মাসের ২৭ তারিখের মধ্যে উহা অনুসন্ধান কর, তাহা হলে তুমি উহাকে পাবে।"

         অধিকাংশ ওলামা এটার উপর একমত। ইমাম আজম (রঃ) এর অনেক রেওয়াত হতে এই তারিখ প্রমানীত হয়েছে। হযরত আবু হানিফা (রঃ) বলেছেন- নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে শ'বে কদর দান করেছেন, "লাইলাতুল কদর" -এর ৯টি হরফ আছে এবং "লাইলাতুল কদর" সূরা কদরের মধ্যে ৩বার এসেছে। সুতরাং ৯ হরফকে ৩বার একত্র করলে ৩ X ৯ = ২৭ হয়। এতে ইঙ্গিত হয় যে অবশ্যই ২৭ তারিখের রাত্রিকে শ'বে কদর বলা হয়। অধিকাংশ বুজুর্গগন এই রাত্রিকে শ'বে কদর বলে মেনে নিয়েছেন।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"যে ব্যক্তি রমযান মোবারকের ২৭ তারিখ রাত্রিকে জিন্দা রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য ২৭ হাজার বছরের এবাদতের সওয়াব লেখেন এবং তার জন্য বেহেশ্‌তে কত সংখক ঘর তৈরী করবেন তা আল্লাহ তা'আলাই জানেন।"

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

"যে ব্যক্তি রমযানের ২৭ তারিখ রাত্রিকে জিন্দা রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কেয়ামতের দিন তাকে বেহেশ্‌তে নেবার জামীন হবেন।"

আল্লাহ তা'আলা ফরমান- "ইন্না আনজালনাহু !"

"হে মুহাম্মদ (সাঃ), আমি নিশ্চয়ই জীব্রাইল (আঃ) এর দ্বারা আপনার উপর উহাকে অর্থাৎ কুরআনকে নাজিল করেছি।"

বহু কিতাবে বর্ণিত আছে, যখন জীব্রাইল (আঃ) আল্লাহর তরফ থেকে সমস্ত কুরআন শরীফ একই সময়ে "লাওহে মাহফুজে" পৌছে দিয়েছিলেন, তখন শ'বে কদরের রাত্রি ছিলো। পুনরায় সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর নাজিল করা হয়েছিলো।

তৎপর আল্লাহ তা'আলা ফরমান- "ফি লাইলাতিল কাদরি।"

"কুরআন কে "লাইলাতুল কাদরে" অর্থাৎ শ'বে কদরের রাত্রে নাজিল করেছি"

"ওয়া মা আদরাকা মা লাইলাতুল কাদরি।"

"হে মুহাম্মদ (সাঃ)! আপনি কি জানেন, "লাইলাতুল কদর" অর্থাৎ শ'বে কদরের বউর্গী কি?"

"লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহরি।"

"শ'বে কদর হাজার মাসের রাত্রি হইতে উত্তম।" অর্থাৎ আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি এই রাত্রে এবাদত করবে, তাকে আমি হাজার মাসের এবাদতের সওয়াব হতেও বেশী সওয়াব প্রদান করবো।

এই রাত্রিকে আল্লাহ তা'আলা এই জন্য খাছ করেছেন যে, একদিন হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নিজ উম্মতের মধ্যে হজরত শামাউন (আঃ) (যিনি বনী ইসরায়েলদের মধ্যে খুব বড় একজন আবেদ অর্থাৎ এবাদতকারী ছিলেন) তার বিষয়ে একটি গল্প বলছিলেন। যিনি হাজার মাস এবাদত করেছিলেন এবং কাফেরদের সাথে জেহাদ করেছিলেন। আল্লাহর রাস্তায়ই জেহাদ করেছিলেন, তার গল্প খুব বড়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ)এর আছহাবগন আফছোছ করে বললেন, "হে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)! আপনার উম্মতের হায়াত এরুপ হবে না, তাহা হলে তারাও ওইরুপ এবাদত করতে পারতো।" হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তখন চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন সূরা কদর নাজিল হলো।

 

রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০০৯

আহলান সাহলান মাহে রমযান…

আল্লাহ তায়ালা হযরত মোহাম্মদ (সঃ) উম্মতের উপর পবিত্র রমযান মাসের রোজা ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি এই ফরজকে অমান্য করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“হে ঈমানদারগন! তোমাদের উপর রমযানের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। নিশ্চয়ই তোমরা ধর্মভীরু হইবে”।

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসুল (সঃ) বলেন- “যে ব্যক্তি পবিত্র রমযানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের গোনাহসমূহ থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে সে যেন এই মূহুর্তে মা এর উদর হতে ভূমিষ্ঠ হলো”।

পবিত্র রমযান মাস অতিশয় বুজর্গী। হযরত মুসা (আঃ) মুনাজাত করেছিলেন- “হে প্রভূ! উম্মতে মোহাম্মদীকে তুমি কোন মাস প্রদান করবে”? উত্তর আসলো- “হে মুসা! আমি তাদেরকে রমযান মাস প্রদান করেছি”। হযরত মুসা (আঃ) আরজ করলেন- “হে প্রভূ, রমযান মাসের ফজিলত কি”? উত্তর আসলো- “পবিত্র রমযান মাসের ফজিলত সমস্ত মাসের উপর এমন, যেমন সমস্ত বান্দার উপর আমার ফজিলত।যে ব্যক্তি এই পবিত্র রমযান মাসে রোজা রাখবে, তার জন্য আমি সমস্ত মানুষের, সমস্ত পরীদের এবং সমস্ত সৃষ্টির এবাদতের পরিমান এবাদত তার আমলনামায় লিখবো”। হযরত মুসা (আঃ) আরজ করলেন- “হে প্রভু, আমাকেও উম্মতে মোহাম্মদীর মধ্যে গ্রহন কর, তাহলে আমিও ওই সওয়াব হতে বঞ্চিত হবনা”। উল্লেখ্যঃ অনেক নবী-রাসুলগনই এই দোয়া করতেন, তাদের মধ্যে জানামতে কেবল হযরত ইসা (আঃ) এর দোয়া কবুল হয়, যার ফলে তিনি শেষ যামানায় উম্মতে মোহাম্মদী হয়ে পৃথিবীতে (জ়েরুজালেমে বায়তুল মুকাদ্দীসের কোন এক মিনারে অবতরন করে) ফিরে আসবেন।

আরও এরকম বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি পবিত্র রমযানের রোজা রাখবে, সমস্ত ফেরেশতা, সমস্ত পশু, কীট-পতঙ্গ ও যত প্রানী পৃথিবীর উপর আছে, এমন কি বৃক্ষলতাও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- “যে ব্যক্তি রমযান মাসে রোজা রাখে, তাকে আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিন একটি যমরূদ পাথরের বাড়ী প্রদান করবে। ঐ বাড়ীর এক হাজার দরজা হবে। প্রত্যেক দরজার সামনে একটি বৃক্ষ হবে। তুমি যদি একশত বৎসর পর্যন্ত এই বৃক্ষে আরোহন করে ছায়ায় ছায়ায় ফির, তারপরেও তুমি তার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেনা”।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- “যে ব্যক্তি রমযান মাসে একদেরহাম ছদকা দিবে, তার অন্য মাসের ছদকা থেকে হাজার দেরহাম ছদকার চাইতেও উত্তম ছদকা হবে”।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- “যে ব্যক্তি রমযান মাসে জুম’আর দিনে এবাদত করে বা কুরআন শরীফ পাঠ করে, সে হাজার বৎসরের চেয়েও বেশী এবাদতের সওয়াব পাবে”।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- “যে ব্যক্তি রমযান মাসের রোজা রাখে ও তার সন্তান-সন্ততি নিয়ে ইফতার করে, তাহলে তাকে আল্লাহতায়ালা এত সওয়াব প্রদান করবেন যে, সে যেন মক্কা, মদীনা ও বাইয়তুল মুকাদ্দীসে রোজা রাখলো। যে ব্যক্তি মক্কা শরীফে রোজা রাখে, সে ৭০ হাজার হজ্জের, ৭০ হাজার ওমরার এবং ৭০ হাজার রমযান মোবারক মাসের সওয়াব পাবে। যে ব্যক্তি মদীনা শরীফে রোজা রাখে, তাকে আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক ঈমানদারের নেকীর পরিমান সওয়াব প্রদান করবেন এবং ওই পরিমান বদ তার থেকে দূর করে বেহেশতে ওই পরিমান উন্নতি দান করবেন। যে ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দীসে রোজা রাখে, তার জন্য সাত আসমানের ও পৃথিবীর ফেরেশতাগন ক্ষমা প্রার্থনা করেন”।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- “আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি রমযান মাসে খাছ আল্লাহর জন্য রোজা রাখে, সে যেন ছয়শত হাজার বন্দীকে আযাদ করলো, ছয়শত হাজার উট কোরবানী করলো এবং ছয়শত হাজার বৎসরের এবাদত করলো”।

হযরত খাজা মুজাফফর কোহস্তানী (রাঃ) এর নিকট রোজা কিছু কারনে পছন্দনীয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

প্রথমতঃ রোজা রুহের ও দিলের অর্থাৎ উভয়কেই স্মরনের দিকে লিপ্ত রাখে।

দ্বিতীয়তঃ রোজা বিবেকের বিপরীত সমুদয় কুকর্ম থেকে ফিরিয়ে রাখে।

তৃতীয়তঃ রোজা নফস্‌ আম্মারার অর্থাৎ পানাহার ও যৌন উত্তেজনার নিবৃত্তি অর্থাৎ সংযম প্রদান করে।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন- “রোজা ছবরের অর্ধেক, ছবর ঈমানের অর্ধেক”।

ইমাম মুহাম্মদ (রাঃ) বলেছেন- চোখের রোজা এই যে, উহা দ্বারা মন্দ বস্তু না দেখা অর্থাৎ নিজ চোখকে নেক কাজের দিকে ফেরানো। অর্থাৎ উহা দ্বারা কোর’আন মজীদ ও হাদীস শরীফ দেখে পড়া, সৎ লোকের মুখদর্শন করা, কুদৃষ্টি না করা। তিনি বলেছেন- কানের রোজা এই যে, উহার দ্বারা গুনাহের কথা ও কুকথা শ্রবন না করা এবং উহা দ্বারা আল্লাহ ও রাসুলের (সঃ) কথা শ্রবন করা। জীহবার রোজা এই যে, ইহা দ্বারা সর্বত্রই আল্লাহ ও রাসুলের (সঃ) নাম প্রচার করা, কোন বৃথা কথা না বলা। বর্ণিত আছে যে, খুব কম কথা বলা জীহবার রোজা। যে ব্যক্তি বেশী কথা বলে, সে ব্যক্তি দুরাবস্থায় পড়ে। ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালী (রঃ) নিজের গ্রন্থাবলীতে লিখেছেনঃ-

“হার ছুখুন বিছিয়ার গোইয়াদ, দর বিগত উফতাদ”

অর্থাৎ- যে কথা বহুবার হয়, তা গীবতের অন্তর্গত হয়ে পড়ে। মুখের ও হাতের রোজা এই যে, উহা দ্বারা কোন শরীয়ত বিরোধী ও কোন গুনাহের কাজ না করা। বরং উহা দ্বারা এমন কাজ করা চাই, যাতে পরকালের ভালো হয়। পায়ের রোজা এই যে, উহাকে এবাদতের দিকে ফিরানো। অর্থাৎ উহা দ্বারা জামাতের নামায পড়তে যাবে অথবা ওয়াজ-নছীহত শুনতে যাবে। সমস্ত শরীরের রোজা এই যে, নিজের সমস্ত শরীরকে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করে দিবে, এই ইচ্ছায় সর্বদা প্রস্তুত থাকা।

শাহ আহম্মদ কাশানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন- “মানুষের উচিৎ নিজের হাত, পা চোখ ও মন ইত্যাদি হারাম ও মাকরূহসমুহ থেকে সংযত রাখা। অন্যথায় ঐগুলির দরুন জ়াহান্নামে যেতে হবে। এর একটি শর্ত আছে যে, রোজার মধ্যে ইফতারের সময় ইফতার করবে, হালাল রুজী দ্বারা এবং তাও বেশী খাবে না। প্রতিদিন একই পরিমান খাবে; সবসময় মনকে ভয় ও ভরসার মধ্যে রাখবে।

“নাফিউল খালায়েক আমলিয়তে কোর’আন” থেকে সংকলিত।

বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০০৯

অনন্য সুযোগের রাত - শবে’এ বরাত

হযরত আবুবকর সিদ্দিকী (রাঃ) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “হে মানবগণ! তোমরা শা’বান মাসের মধ্যরাত্রিতে অর্থাৎ শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে উঠো! ওই রাত্রি অত্যন্ত পবিত্র। ওই রাত্রে আল্লাহ্‌তায়ালা বলেন, “হে মানবগণ, তোমাদের মধ্যে কি এমন কেহ আছে যে তোমরা আমার নিকট ক্ষমা চাও? আমি ক্ষমা করিয়া দিবো”।” সুতরাং শা’বানের রাত্রি অতি বরকতের রাত্রি। যে ব্যক্তি এইরাত্রে এবাদত করে সে, বহুত ছওয়াব পাইবে।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমাকে জ়িবরাইল (আঃ) উপদেশ দিয়েছেন যে, আপনার উম্মতদিগকে বলে দিন যে, তারা যেন শবে-বরাতকে জিন্দা রাখে, তা হলে তারা যেন শবে-কদরকেও জিন্দা রাখলো।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ১৫ শা’বানের রাত্রিতে আল্লাহ্‌তায়ালা সমস্ত এবাদতকারীকে, নেককারকে ও বদকারকে মাফ করে দিবেন। কিন্তু যাদুকরকে, গনককে, কৃপণকে, পিতা-মাতাকে কষ্ট-প্রদানকারীকে, শরাবখোরকে, জেনাকার পুরুষ ও স্ত্রী-লোককে এবং মাদকদ্রব্য সেবনকারীকে মাফ করবেন না। তবে তওবা (জীবনের তরে আর কখনও সেই কাজ করবেনা এই বলে অনুতাপ করে আল্লাহ্‌ গাফুরুররাহীমের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা) করলে মাফ করবেন।

১৫ই শা’বানের রাত্রে আল্লাহ্‌তায়ালা মুসলমানদিগকে বলেন, “যে আমার নিকট মাফ চাইবে, তাকে মাফ করবো”। আল্লাহ্‌তায়ালা বলেছেন, “উক্ত তারিখে যে আমার নিকট সাস্থ্য প্রার্থনা করবে, আমি তাকে সাস্থ্য প্রদান করবো। যদি গরীব থাকে এবং আমার কাছে ধনী হবার জন্য প্রার্থনা করে, তা হলে আমি তাকে ধনী করে দিবো”।

আমলঃ

১।

১৫ই শা’বানের রাত্রিতে সন্ধ্যার পরে গোসল করা উচিৎ। এটা মোস্তাহাব। হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ১৫ই শা’বানের রাত্রিতে এবাদতের নিয়তে গোসল করে, তার জন্য প্রত্যেক ফোটা পানিতে ৭০০ রাক্‌য়াত নফল নামাযের ছওয়াব লেখা যাবে”। গোসলের পর ২ রাক্‌য়াত তাহইয়াতুল ওয়াজু নামায পড়বে। প্রত্যেক রাক্‌য়াতে সুরা ফাতিহার পর ১ বার আয়াতুল কুরসি্‌ ও ২৫ বার সুরা এখলাস্‌ পড়বে। তাহইয়াতুল ওয়াজু হতে অবসর হয়ে আট রাক্‌য়াত নফল নামায পড়বে। প্রত্যেক রাক্‌য়াতে সুরা ফাতিহার পর ১ বার সুরা কদর ও ২৫ বার সুরা এখলাস্‌ পড়বে। হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এই নামায শা’বানের রাত্রিতে অর্থাৎ ১৫ তারিখের রাত্রে আদায় করবে, তার সমস্ত গুনাহ্‌ মাফ হয়ে যাবে এবং নব-প্রসূত শিশুর মত গুনাহ্‌ হতে পবিত্র হয়ে যাবে”।

২।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রে প্রতি রাক্‌য়াতে সুরা ফাতিহার পর ৫০ বার সুরা এখলাস্‌ পাঠ করতঃ ৪ রাক্‌য়াত নফল নামায শেষ করে ও ১৫ তারিখে রোযা রাখে, আল্লাহ্‌তায়ালা তার ৫০ বৎসরে গুনাহ মাফ করে দিবেন”।

৩।

অন্য এক রেওয়াতে আছে, যে ব্যক্তি ১৫ই শা’বানের রাত্রে প্রতি রাক্‌য়াতে সুরা ফাতিহার পর ১০ বার সুরা এখলাস্‌ পাঠ করতঃ ১০০ রাক্‌য়াত নফল নামায শেষ করে, তার সমস্ত গুনাহ আল্লাহ্‌তায়ালা মাফ করে দিবেন এবং তার ১০০ অভাব পূর্ণ করে দিবেন, তার জন্য বেহেশ্‌ত হালাল ও দোযখ হারাম করে দিবেন।

৪।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি শা’বানের ১৫ তারিখের রাত্রে প্রতি রাক্‌য়াতে সুরা ফাতিহার পর যেকোন সুরা অথবা সুরা এখলাস্‌, সুরা কাফেরুন, সুরা নাছ ও সুরা ফালাক দ্বারা ১৪ রাক্‌য়াত নফল নামায এবং নামাযের মধ্যে আয়াতুল কুরসি্‌ ১ বার ও লাকাদ জা-আকুম শেষ পর্যন্ত ১ বার পাঠ করতঃ সালাম ফিরিয়ে যে দোয়া প্রার্থনা করবে, সেই দোয়াই কবুল হবে”।

৬।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ১৫ই শা’বানের দিনে রোযা রাখবে, সে দোযখের আগুন হতে মুক্তি লাভ করবে”।

৭।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি শা’বান মাসের শুক্রবার প্রতি রাক্‌য়াতে সুরা ফাতিহার পর ৩০ বার সুরা এখলাস্‌ দ্বারা ৪ রাক্‌য়াত নফল নামায পড়ে, সে একটি হজ্জ ও একটি ওমরার ছওয়াব পাবে”।

৮।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ১৫ই শা’বানের রাত্রে ১০০ বার ও দিনে ১০০ বার আমার উপর দরূদ শরীফ পড়বে, তার উপর দোযখের আগুন হারাম হয়ে যাবে এবং আল্লাহ্‌তায়ালা তাকে বেহেশ্‌তে দাখিল করবেন”।

৯।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি শা’বান মাসের দিনে ও রাত্রে আমার উপর ১০০ বার দরূদ পড়বে, আল্লাহ্‌তায়ালা তাকে দোযখের আগুন হতে বাচাবে এবং কেয়ামতের দিন আমি সকলের আগে তার জন্য শাফায়াত করবো”।

১০।

হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি শা’বানের মাসে ৩ হাজার বার দরূদ শরীফ পড়বে, তাহা হলে কেয়ামতের দিন তার জন্য শাফায়াত করা আমার জন্য ওয়াজীব হয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ্‌!

১১।

হযরত আবুল কাছেম ছাফ্‌ফার (রাঃ) হতে বর্ণিত, “আমি হযরত ফাতেমা (রাঃ) কে খাবে দেখিলাম। আমি বললাম, হে খাতুনে জান্নাত! আপনি এমন কি বস্তু ভালোবাসেন, যা আপনার রুহের জন্য দান করিব? ফাতেমা (রাঃ) বলিলেন, হে আবুল কাছেম! আমি শা’বান মাসে ৮ রাক্‌য়াত নামায ভালোবাসি। উহা ৪ বৈঠকে ও ১ সালামে পড়তে হবে। প্রত্যেক রাক্‌য়াতে সুরা ফাতিহার পর সুরা এখলাস্‌ ১১ বার করে পড়বে! যে ব্যক্তি উক্ত প্রনালীতে এই নামায পড়বে এবং আমাকে ছওয়াব বখশীশ দিবে; আমি তার জন্য শাফায়াত না করে কখনও বেহেশ্‌তে এক পা-ও দিব না। এই নামাজ শা’বান মাসের যে কোন রাত্রে আদায় করিবে। যদি এই মাসের প্রথম ভাগের রাত্রে পড়ে, তা হলে খুবই উত্তম অথবা যে কোন রাত্রে ইচ্ছা পড়তে পারবে”।

হাদীছ শরীফে এসেছে-

“যে ব্যক্তি শা’বানের ১৫ তারিখে রোযা রাখবে, তাকে কখনও দোযখের আগুন স্পর্শ করবে না”।

১৫ শা’বানে আসমান থেকে লক্ষ লক্ষ ফেরেশতে দুনিয়ায় নেমে আসেন এবং ওই রাত্রে এবাদতকারীদেরকে দেখেন এবং তাদের জন্য রোজ কেয়ামত পর্যন্ত ছওয়াব লিখতে থাকেন, তারপরেও সেটা পূর্ণ হবেনা। পরে রোজ কেয়ামতের দিন আল্লাহ্‌তায়ালা ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলবেন, “হে ফেরেশতাগন, তোমরা এখন ছওয়াব লেখা বন্ধ করো। আমি বিনা হিসাবে আমার বান্দাকে বেহেশ্‌তে নিয়ে যাবো। তোমরা আমার বান্দাদের ছওয়াব লিখে শেষ করতে পারবেনা। বরং আসমান জমীনের ফেরেশতারা একত্রিত হয়েও যদি ছওয়াব লিখতে থাকো, তারপরেও এটা পূর্ণ হবেনা।

পরিশেষে আমার কিছু কথা-

আলহামদুলিল্লাহ! আমি আল্লাহ্‌র শুকুর গুজার করে শেষ করতে পারবোনা তার একটা কারন হলো- আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এই আমি যদি আজ মুসলমানের ঘরে না হয়ে কোন অন্য ধর্মের ঘরে হতাম! তাহলে সারা জীবন আমাকে কিছু চরম মিথ্যা বুনিয়াদের উপর বসে থাকতে হত, যার পরিনামও ভয়াবহ। আমি কিভাবে এ ধন্যবাদ জানাবো? এর কোন ভাষা আমার কাছে নেই।

কিন্তু তারপরেও, মুসলমান হয়েও কি আমি পুরোপুরি নিরাপদ আছি, আমার মনে হচ্ছে না। তবে হ্যা, অন্য ধর্মে থাকলে হয়তো ভবিষ্যতের ভয়বহতাটা জানতে পারতামনা, এখন বরং কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি, এটুকুই পার্থক্য। তবে সেই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার বহু সুযোগ আমাদের দেওয়া হয়, যেটাও আমরা হেলায় হারিয়ে দিই। তাই আমি এই হাদীছ পাঠকদের অনুরোধ করবো- সবগুলো না পারেন, একাধিকও যদি না পারেন, অন্তত একটা আমল করেন, যেটা আপনার কাছে সহজ মনে হয়। আর যেহেতু এই রাত্রে দোয়া কবুলের একটা সুযোগ আছে, যেটা আমরা অনেক ভাবে ব্যবহার করতে চাই, আমি বলবো সেগুলোর চাইতে এই প্রার্থনাটা অন্যতম মুখ্য হওয়া উচিৎ-

ক) “ইয়া আল্লাহ্‌, আমার অতীতের সমস্ত গোনাহ্‌ থেকে রেহাই দিয়ে, ভবিষ্যতের সমস্ত ফরয ও সুন্নাত সঠিকভাবে আদায় করার তৌফিক দাও মালিক”!

খ) “সমস্ত হারাম থেকে হেফাজত করে আমাকে হালাল বস্তু দান করো”!!

গ) “আমার মনকে তোমার পথের দিকে সুপরিবর্তীত করো!!! আমীন”।

বিশেষ করে আমার মতে সুরা ফাতিহার শেষ ২ আয়াত এখানে সবচেয়ে উপযোগী প্রার্থনা।

সুরা ফাতিহাঃ

৬ষ্ঠ আয়াত- “আমাদিগকে সরল পথ দেখাও”।

৭ম বা শেষ আয়াত- “সে সমস্ত লোকেদের পথ যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গযব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট”।

আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দিন। আমীন।